লক্ষ্মীপূজা দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা — সম্পদ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রার্থনা। বাংলায় প্রধান লক্ষ্মীপূজা হয় দুর্গাপূজার পরের পূর্ণিমায়, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা নামে — ২০২৬ সালে রবিবার, ২৫ অক্টোবর। এই লেখায় ঘরে বসে পূজার সম্পূর্ণ বিধি, উপকরণ ও আরতি দেওয়া হল।
বাংলায় লক্ষ্মীপূজা কখন হয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বাংলার বাইরে ভারতের বহু অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজা হয় দীপাবলির রাতে, অমাবস্যায়। কিন্তু বাংলার পরম্পরা আলাদা:
- কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা — বাংলার প্রধান লক্ষ্মীপূজা, হয় দুর্গাপূজার পরের পূর্ণিমায় (আশ্বিন মাসের শারদ পূর্ণিমা), বিজয়া দশমীর প্রায় পাঁচ দিন পরে।
- দীপাবলির রাত — বাংলায় এই রাতে মূলত কালীপূজা হয়, লক্ষ্মীপূজা নয়।
- প্রতি বৃহস্পতিবার — বহু বাঙালি গৃহে সাপ্তাহিক লক্ষ্মীপূজা ও পাঁচালি পাঠের রীতি রয়েছে।
২০২৬ সালে লক্ষ্মীপূজা ও কালীপূজা কবে?
| পূজা | তারিখ (২০২৬) |
| কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর — পূর্ণিমা তিথি ২৫–২৬ অক্টোবরের রাত জুড়ে |
| কালীপূজা ও দীপাবলি (অন্যত্র লক্ষ্মীপূজা) | রবিবার, ৮ নভেম্বর |
তিথির সঠিক সময় স্থানভেদে কয়েক মিনিট আলাদা হতে পারে; পরিবারের পঞ্জিকা মিলিয়ে নিন।
কোজাগরী নামটি এসেছে “কো জাগর্তি” থেকে — অর্থাৎ “কে জেগে আছে?” বিশ্বাস, সেই রাতে দেবী লক্ষ্মী ঘুরে বেড়ান এবং যে গৃহ জেগে থেকে তাঁর আরাধনা করে, সেখানেই তিনি অধিষ্ঠান করেন। তাই এই রাতে জাগরণের রীতি।
নিচের বিধি দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য — কোজাগরী পূর্ণিমা হোক বা দীপাবলির সন্ধ্যা।
লক্ষ্মীপূজা কেন করা হয়?
বিশ্বাস করা হয়, দেবী লক্ষ্মী সেই গৃহে অধিষ্ঠান করেন যা পরিচ্ছন্ন, আলোকিত ও ভক্তিপূর্ণ। পুরাণ অনুসারে সমুদ্রমন্থনের সময় দেবী লক্ষ্মী ক্ষীরসাগর থেকে আবির্ভূত হন — সেই কাহিনিই তাঁর আরাধনার ভিত্তি। বাংলার দুর্গাপ্রতিমায় লক্ষ্মী দুর্গার কন্যা রূপে পাশে থাকেন।
পূজার সূচনায় শ্রীগণেশের আরাধনা করা হয়, কারণ তিনি বিঘ্নহর্তা — তাঁর আশীর্বাদে পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
পূজার আগে কী প্রস্তুতি নেবেন?
- ঘর পরিষ্কার করুন। পরিচ্ছন্ন গৃহেই দেবী অধিষ্ঠান করেন বলে বিশ্বাস।
- আলপনা দিন। বাংলার রীতিতে চালের গুঁড়ো গুলে সাদা আলপনা আঁকা হয় — প্রবেশপথ থেকে পূজার স্থান পর্যন্ত দেবীর পদচিহ্ন আঁকার রীতিও প্রচলিত।
- প্রদীপ জ্বালুন। ঘরের প্রতিটি কোণে প্রদীপ দিয়ে অন্ধকার দূর করুন।
- আসন প্রস্তুত করুন। লাল বা হলুদ কাপড় পেতে তার উপর লক্ষ্মী ও গণেশের প্রতিমা বা ছবি পাশাপাশি রাখুন।
- উপকরণ গুছিয়ে রাখুন। পূজা শুরুর আগেই সব সামগ্রী হাতের কাছে রাখুন।
পূজার উপকরণ কী কী লাগবে?
| উপকরণ | ব্যবহার |
| লক্ষ্মী ও গণেশের প্রতিমা বা ছবি | মূল আরাধ্য |
| ঘট (জল, আমপাতা ও ডাব-নারকেল সহ) | শুদ্ধতা ও প্রাণের প্রতীক |
| লাল বা হলুদ কাপড় | আসন পাতার জন্য |
| প্রদীপ ও ধূপকাঠি | পূজার পরিবেশ |
| ফুল ও মালা (পদ্ম বিশেষ শুভ) | নিবেদনের জন্য |
| মুদ্রা বা নোট | সম্পদের প্রতীকী নিবেদন |
| নাড়ু, মিষ্টি, ফল ও শুকনো ফল | ভোগ ও প্রসাদ |
| চাল, হলুদ, সিঁদুর, চন্দন | তিলক ও পূজার কাজে |
| পঞ্চামৃত (দুধ, মধু, দই, ঘি, চিনি) | শুদ্ধিকরণের জন্য |
কোজাগরী পূজায় বাংলার রীতিতে অতিরিক্ত থাকে নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মোয়া, মুড়কি, খই, চিঁড়ে ও খিচুড়ি ভোগ — এবং পূজার শেষে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ।
ধাপে ধাপে পূজার বিধি
১. স্থান শুদ্ধ করুন
গঙ্গাজল ছিটিয়ে ঘর ও পূজার স্থান শুদ্ধ করুন। ধূপ ও প্রদীপ জ্বালিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন।
২. গণেশ বন্দনা
প্রথমে গণেশের আরাধনা করুন। ফুল, চাল ও মিষ্টি নিবেদন করে জপ করুন:
ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ
৩. দেবী লক্ষ্মীর আবাহন
মন্ত্র জপ করে দেবীকে আহ্বান করুন:
ওঁ শ্রীং মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ
ফুল, চাল ও সিঁদুর নিবেদন করুন এবং প্রতিমার সামনে মুদ্রা বা নোট রাখুন।
৪. ঘটস্থাপন
জলপূর্ণ ঘটের উপর লাল কাপড়ে জড়ানো নারকেল রাখুন। আমপাতা সাজিয়ে হলুদ ও সিঁদুরের ফোঁটা দিন।
৫. ভোগ নিবেদন
নাড়ু, মিষ্টি, ফল ও শুকনো ফল নিবেদন করুন। ঘরের চারপাশে প্রদীপ জ্বালুন।
৬. মূল পূজা
প্রতিমায় চন্দনের তিলক দিন। পদ্মফুল ও অক্ষত নিবেদন করে গোলাপজল ছিটিয়ে দিন। এরপর লক্ষ্মীস্তোত্র বা দেবীর অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করুন।
৭. লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ
বাংলার রীতিতে এই পর্বই পূজার কেন্দ্র। পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে পাঁচালি ও ব্রতকথা শোনেন।
৮. হালখাতা ও কর্মস্থলের পূজা
ব্যবসায়ীরা হিসাবের খাতা, নথি বা কম্পিউটারের পূজা করেন — আগামী বছরের সাফল্য কামনায়।
৯. আরতি
ঘণ্টা বাজিয়ে ভক্তিভরে আরতি করুন এবং পূজা সম্পন্ন করুন।
লক্ষ্মী আরতি
নিচের আরতিটি “ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা” — সারা ভারতে প্রচলিত হিন্দি আরতি, বাংলা লিপিতে দেওয়া হল। বাংলার নিজস্ব পরম্পরায় এই সময়ে লক্ষ্মীর পাঁচালি ও ব্রতকথা পাঠের রীতি বেশি প্রচলিত।
ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা, মৈয়া জয় লক্ষ্মী মাতা।
তুমকো নিশিদিন সেবত, হরি বিষ্ণু বিধাতা॥
ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা॥
উমা রমা ব্রহ্মাণী, তুম হী জগ মাতা।
সূর্য চন্দ্রমা ধ্যাবত, নারদ ঋষি গাতা॥
দুর্গা রূপ নিরঞ্জনি, সুখ সম্পত্তি দাতা।
জো কোই তুমকো ধ্যাবত, ঋদ্ধি সিদ্ধি ধন পাতা॥
তুম পাতাল নিবাসিনী, তুম হী শুভদাতা।
কর্ম প্রভাব প্রকাশিনী, ভবনিধি কী ত্রাতা॥
জিস ঘর মেঁ তুম রহতীঁ, সব সদ্গুণ আতা।
সব সম্ভব হো জাতা, মন নহিঁ ঘবরাতা॥
তুম বিন যজ্ঞ ন হোতে, বস্ত্র ন কোই পাতা।
খান পান কা বৈভব, সব তুমসে আতা॥
শুভ গুণ মন্দির সুন্দর, ক্ষীরোদধি জাতা।
রত্ন চতুর্দশ তুম বিন, কোই নহিঁ পাতা॥
মহালক্ষ্মীজী কী আরতি, জো কোই জন গাতা।
উর আনন্দ সমাতা, পাপ উতর জাতা॥
ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা॥
পূজার উপযুক্ত সময় কোনটি?
- কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা — পূর্ণিমা তিথিতে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত; মধ্যরাত্রি সবচেয়ে শুভ বলে ধরা হয়। জাগরণের রীতি থাকায় পূজা রাতেই হয়। ২০২৬ সালে ২৫ অক্টোবরের রাত।
- দীপাবলির লক্ষ্মীপূজা — প্রদোষ কালে, অর্থাৎ সূর্যাস্ত থেকে শুরু হওয়া প্রায় আড়াই ঘণ্টার সময়ে। ২০২৬ সালে ৮ নভেম্বর, আনুমানিক সন্ধ্যা ৬:২৫ থেকে ৮:৩০ (IST, দিল্লি)।
তিথি ও সময় প্রতি বছর বদলায় এবং স্থানভেদে আলাদা হয়। সঠিক সময়ের জন্য আপনার স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নিন।
পূজার পরে কী করবেন?
- পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করুন।
- অন্তত একটি প্রদীপ সারারাত জ্বালিয়ে রাখুন — পর্দা ও শিশুদের থেকে দূরে, নিরাপদ জায়গায়।
- কোজাগরীর রাতে সম্ভব হলে জেগে থেকে নামগান বা পাঠ করুন।
- পূজার পর কিছুক্ষণ মূল দরজা খোলা রাখার রীতি রয়েছে।
সাধারণ প্রশ্ন
২০২৬ সালে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা কবে?
২০২৬ সালে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা রবিবার, ২৫ অক্টোবর, দুর্গাপূজার পরের শারদ পূর্ণিমায়। পূর্ণিমা তিথি ২৫–২৬ অক্টোবরের মধ্যরাত্রি জুড়ে থাকায় পূজা ২৫ অক্টোবরের রাতে হয়; সঠিক সময়ের জন্য পরিবারের পঞ্জিকা দেখে নিন।
বাংলায় লক্ষ্মীপূজা দীপাবলিতে হয় না কেন?
বাংলায় প্রধান লক্ষ্মীপূজা হয় দুর্গাপূজার পরের পূর্ণিমায় — কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা — আর দীপাবলির অমাবস্যার রাতে হয় কালীপূজা। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে দীপাবলির রাতেই লক্ষ্মীপূজা হয়; ২০২৬ সালে কালীপূজা ও দীপাবলি রবিবার, ৮ নভেম্বর।
“কোজাগরী” শব্দের অর্থ কী?
কোজাগরী শব্দটি এসেছে সংস্কৃত কো জাগর্তি থেকে, অর্থাৎ কে জেগে আছে? বিশ্বাস, শারদ পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান এবং যে গৃহে ভক্তরা জেগে থেকে তাঁর আরাধনা করেন, সেখানে অধিষ্ঠান করেন; তাই এই রাতে জাগরণের রীতি।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় কী ভোগ দেওয়া হয়?
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় বাংলার রীতিতে নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মোয়া, মুড়কি, খই, চিঁড়ে, ফল ও মিষ্টি এবং অনেক পরিবারে খিচুড়ি ভোগ নিবেদন করা হয়। ঘট, প্রদীপ, ধূপ, পদ্মফুল, চাল, সিঁদুর ও চন্দনও পূজার উপকরণ।
লক্ষ্মীর পাঁচালি কী?
লক্ষ্মীর পাঁচালি বাংলায় প্রচলিত পয়ার ছন্দে রচিত ব্রতকথা ও স্তব, যা কোজাগরী ও বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীপূজার শেষে পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে পাঠ করেন বা শোনেন। বাংলার রীতিতে পাঁচালি পাঠই পূজার কেন্দ্রীয় অংশ।
লক্ষ্মীপূজায় কোন মন্ত্র জপ করা হয়?
লক্ষ্মীপূজার প্রধান মন্ত্র ওঁ শ্রীং মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ, যেখানে শ্রীং দেবী লক্ষ্মীর বীজমন্ত্র; তার আগে গণেশের জন্য ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ জপ করা হয়। সেই সঙ্গে লক্ষ্মীস্তোত্র ও দেবীর অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করা হয়।
আলপনা কেন দেওয়া হয়?
লক্ষ্মীপূজায় চালের গুঁড়ো গুলে সাদা আলপনা দেওয়া হয় দেবীকে স্বাগত জানাতে, এবং প্রবেশপথ থেকে পূজার স্থান পর্যন্ত লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকা হয় যাতে দেবী গৃহে প্রবেশ করেন। ধানের শিষ, পদ্ম ও পেঁচার নকশা আলপনার প্রচলিত বিষয়।
গণেশের পূজা আগে করা হয় কেন?
গণেশ বিঘ্নহর্তা, তাই প্রতিটি হিন্দু পূজার সূচনায় তাঁকে স্মরণ করা হয়, যাতে পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মী ও গণেশের প্রতিমা বা ছবি পাশাপাশি রাখা হয়।