কর্ণাটকের হাম্পি আসলে বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষ, যা ছিল দক্ষিণ ভারতের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের রাজধানী। তুঙ্গভদ্রা নদীর ধারে পাথরের চাঁই ছড়ানো প্রান্তরজুড়ে ছড়িয়ে আছে মন্দির, বাজার, রাজকীয় প্রাঙ্গণ ও জলব্যবস্থার নিদর্শন। এটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, আর এর বিস্তার এত বড় যে কতগুলো জায়গা দেখছেন তার চেয়ে কীভাবে সেগুলোকে ভাগ করে নিচ্ছেন সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় জানাচ্ছি হাম্পি কী, কীভাবে পৌঁছাবেন, কখন যাবেন এবং তিন দিনকে কীভাবে সাজানো যায়।

এক নজরে হাম্পি
| অবস্থান | কর্ণাটক, তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে, হোসাপেটে (হসপেট) শহরের কাছে |
| এটি কী ছিল | বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী, দক্ষিণ ভারতের এক মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্য (১৪শ–১৬শ শতক) |
| বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা | ১৯৮৬ সালে “গ্রুপ অব মনুমেন্টস অ্যাট হাম্পি” নামে তালিকাভুক্ত |
| বিস্তার | প্রায় ৪,১০০ হেক্টর জুড়ে ১,৬০০-র বেশি টিকে থাকা নিদর্শন, ইউনেস্কোর বরাত দিয়ে একটি ভ্রমণ নির্দেশিকার উল্লেখ অনুযায়ী |
| ভ্রমণের সেরা মাস | অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ |
| প্রস্তাবিত সময় | প্রথমবারের সফরের জন্য তিন দিন |
হাম্পি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিজয়নগর ছিল তার সময়ের সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরগুলোর একটি। একটি নির্দেশিকা এই রাজধানীর সময়কাল ১৩৩৬–১৫৬৫ বলে উল্লেখ করেছে; বেশিরভাগ বিবরণে এর উৎকর্ষের কাল সহজভাবে ১৪শ থেকে ১৬শ শতক ধরা হয়। আজ দর্শনার্থীরা যা দেখেন তা হলো এর স্মারক কেন্দ্র: মন্দির, বাজার, প্রাকার, প্রাসাদ ও আস্তাবল। এই বৈচিত্র্যই হাম্পির আকর্ষণ। এটি কোনো একটি স্মৃতিসৌধ নয়, একটি পুরো নগর, আর বিরূপাক্ষ মন্দিরকে ঘিরে পবিত্র কেন্দ্র থেকে শুরু করে রাজকীয় প্রাঙ্গণ ও নদীতীরের বিঠ্ঠল প্রাঙ্গণ পর্যন্ত এর বিন্যাস কেমন ছিল তা আপনি নিজের চোখে পড়ে নিতে পারবেন।
হাম্পিতে কীভাবে পৌঁছাবেন
- ট্রেনে: হাম্পির নিজস্ব কোনো রেলস্টেশন নেই। সবচেয়ে কাছের স্টেশন হোসাপেটে (হসপেট) জংশন, প্রায় ১২–১৩ কিমি দূরে। বেঙ্গালুরু থেকে হাম্পি সরাসরি কোনো ট্রেন নেই; বেশিরভাগ ভ্রমণকারী হোসাপেটে পৌঁছে সেখান থেকে বাস, অটো বা ক্যাব নেন।
- বাসে: হোসাপেটে ও হাম্পির মধ্যে শহরের বাস প্রায় প্রতি ১৫–২০ মিনিট অন্তর চলে এবং কমলাপুর হয়ে যায়, যেখানে ধ্বংসাবশেষের প্রায় অর্ধেক রয়েছে। ভাড়া বদলায়, তাই স্থানীয়ভাবে জেনে নিন। বেঙ্গালুরু ও অন্যান্য শহর থেকে হোসাপেটে দূরপাল্লার বাসও চলে।
- বিমানে: সবচেয়ে কাছের বিমানক্ষেত্র তোরণগাল্লুর কাছে জিন্দাল বিজয়নগর (বিদ্যানগর) বিমানবন্দর, প্রায় ৩৫–৪০ কিমি দূরে। জেলা পর্যটন ওয়েবসাইটে উড়ান (UDAN) প্রকল্পের আওতায় বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদের ফ্লাইটের কথা আছে, তবে পরিষেবা সীমিত, তাই বুকিংয়ের আগে নিশ্চিত হয়ে নিন। হুবলি বিমানবন্দর প্রায় ১৪৫–১৫০ কিমি দূরে, আর সবচেয়ে কাছের বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেঙ্গালুরু প্রায় ৩৫০ কিমি দূরে।
- সড়কপথে: বেঙ্গালুরু থেকে হাম্পি প্রায় ৩৫০ কিমি।
ভ্রমণের সেরা সময়
আউটলুক ট্র্যাভেলার সহ বেশিরভাগ নির্দেশিকা বর্ষার পরের শীতকাল, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি (কেউ কেউ বলেন মার্চ), কে সবচেয়ে আরামদায়ক ঋতু বলেছে, যখন দিন ঠান্ডা আর রাত আরও শীতল। হাম্পি উৎসব (বিজয়নগর উৎসব) সরকারি সূচি অনুযায়ী নভেম্বর বা জানুয়ারিতে হয়, তাই চলতি বছরের তারিখ দেখে নিন। আউটলুক ট্র্যাভেলার জানিয়েছে যে হাম্পি সপ্তাহের সব দিন খোলা থাকে, আর একটি নির্দেশিকায় স্মৃতিসৌধগুলোর সাধারণ সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট বলা হয়েছে। সময় বদলায়, তাই আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া বা স্থানীয় পর্যটন দপ্তরের কাছে নিশ্চিত হয়ে নিন।
হাম্পির বিন্যাস বোঝা
হাম্পিকে চারটি এলাকায় ভাগ করে ভাবলে সহজ হয়:
- পবিত্র কেন্দ্র: বিরূপাক্ষ মন্দির, হাম্পি বাজার (মন্দিরের মুখোমুখি প্রাচীন মণ্ডপের লম্বা সড়ক), হেমকূট পাহাড় ও মাতঙ্গ পাহাড়।
- রাজকীয় কেন্দ্র: লোটাস মহল, হাতিশাল, রানির স্নানাগার ও হাজারা রাম মন্দির।
- বিঠ্ঠল প্রাঙ্গণ: হাম্পির উত্তর-পূর্বে, নদীর ধারে এবং আনেগুন্দি গ্রামের বিপরীত দিকে।
- আনেগুন্দি: নদীর ওপারের গ্রাম, যেখানে আলাদাভাবে যেতে হয়।
তিন দিনের পরিকল্পনা
আউটলুক ট্র্যাভেলারের ভ্রমণসূচিতে প্রথম দিন খুব ভোরে বিঠ্ঠল মন্দির দিয়ে শুরু করতে এবং দ্বিতীয় দিন বিরূপাক্ষ মন্দিরে কাটাতে বলা হয়েছে। বাকিটা সাজানোর একটি যুক্তিসঙ্গত উপায় নিচে দেওয়া হলো। এটি একটি পরামর্শ মাত্র, বাঁধাধরা পথ নয়।
প্রথম দিন: বিঠ্ঠল প্রাঙ্গণ
ভোরে যান। বিজয় বিঠ্ঠল মন্দির বিঠ্ঠলকে, অর্থাৎ বিষ্ণুর এক রূপকে উৎসর্গিত, আর এর উঠোনে রয়েছে পাথরের রথ, যা হাম্পির প্রতীক। জেলা পর্যটন ওয়েবসাইটে রঙ্গ মণ্ডপের ৫৬টি সংগীত-স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোতে আঘাত করলে সুর বেজে ওঠে; সেগুলো ছোঁয়া এখন অনুমোদিত কি না, তা সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নিন। প্রায় ২ কিমি দীর্ঘ নদীতীরের পথ, কম্পা ভূপের পথ, হাম্পি বাজারকে বিঠ্ঠল প্রাঙ্গণের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তাই নদীর ধার ধরে হেঁটে গ্রামের দিকে ফিরে আসা যায়।
দ্বিতীয় দিন: পবিত্র কেন্দ্র
শুরু করুন বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে, যা শিবের উদ্দেশে নিবেদিত এবং বেশ কয়েকটি নির্দেশিকায় এখনও সক্রিয় উপাসনাস্থল হিসেবে বর্ণিত। এরপর হাম্পি বাজারে হাঁটুন, তারপর হেমকূট পাহাড়ে উঠুন, যেখানকার জৈন মন্দির ও প্রাচীন মন্দিরগুলো বিজয়নগর সাম্রাজ্যেরও আগের। বিকেলের শেষে সূর্যাস্ত দেখার চেনা জায়গা মাতঙ্গ পাহাড়; একটি নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রায় ২,২০০টি ধাপ রয়েছে, তাই প্রস্তুতি নিয়ে যান।
তৃতীয় দিন: রাজকীয় কেন্দ্র, সময় থাকলে আনেগুন্দি
লোটাস মহল দেখুন, এটি দোতলা মণ্ডপ, নিচে খোলা খিলানওয়ালা বারান্দা আর ওপরে ঝুলবারান্দা; খাঁজকাটা খিলান থেকেই এর নাম, এবং এতে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যরীতির মিশ্রণ ফুটে ওঠে। কাছেই রয়েছে হাতিশাল, রাজকীয় হাতিদের আশ্রয় দেওয়া একটি লম্বা মণ্ডপ, এবং হাজারা রাম মন্দির। হাতে সময় থাকলে নদীর ওপারের আনেগুন্দি গ্রাম, যা আউটলুক ট্র্যাভেলারের ভ্রমণসূচির অপর ঐচ্ছিক গন্তব্য। সাম্রাজ্যের ইতিহাস বুঝতে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরটিও দেখার মতো।
পাথরের রথ সম্পর্কে
পাথরের রথ হাম্পির সবচেয়ে বেশি ছবি-তোলা স্মৃতিসৌধ, এবং এটি ভারতের ₹৫০ নোটে দেখা যায়। নির্দেশিকাগুলোতে সাধারণত একে একটিমাত্র গ্র্যানাইট খণ্ড থেকে খোদাই করা বলা হয়, কিন্তু শিল্প-ইতিহাসের বিবরণ অনুযায়ী এর চাকাগুলো আলাদা আলাদা খণ্ড থেকে কাটা, তাই “একটিমাত্র খণ্ড” দাবিটি সতর্কতার সঙ্গে নিন। রথটি গরুড়ের উদ্দেশে নিবেদিত একটি মন্দির, কৃষ্ণদেবরায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৬শ শতকের বলে নির্ধারিত। এর চাকাগুলো ঘোরার জন্য তৈরি হলেও এখন আর ঘোরে না, এবং সামনের হাতিগুলো আসল ঘোড়ার জায়গা নিয়েছে।
এই লেখায় ব্যবহৃত সূত্র: আউটলুক ট্র্যাভেলারের হাম্পি ভ্রমণসূচি ও স্থাপত্য নির্দেশিকা; বিজয়নগর জেলা পর্যটনের পৃষ্ঠাসমূহ (vijayanagara.nic.in); হাম্পি বিষয়ক উইকিপিডিয়া ও উইকিভয়েজ নিবন্ধ; রাফ গাইডস; hampi.in; পাথরের রথ বিষয়ে ইম্পার্ট এনসাইক্লোপিডিয়া অব আর্টের নিবন্ধ; এবং উপরে নাম উল্লেখ করা অন্যান্য ভ্রমণ নির্দেশিকা। যেখানে বিবরণে অমিল আছে, সেখানে লেখায় তা জানানো হয়েছে। ছবিটি ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে ব্যবহৃত এবং নিচে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে।